চীনা সবুজ চায়ের তিন কাপে আড্ডা জমছে আফ্রিকায়

চীনা সবুজ চায়ের তিন কাপে আড্ডা জমছে আফ্রিকায়

ছবিঃ সংগৃহীত।

পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে চা শুধু একটি পানীয় নয়।দিনের ব্যস্ততার মাঝে একটু বসা, গল্প করা, আড্ডা দেওয়া- সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে চা।

আর এই চায়ের বড় অংশই আসে চীন থেকে।

মৌরিতানিয়ার সরকারি অফিস থেকে শুরু করে সেনেগাল, মালি ও নাইজারের রাস্তার পাশের ছোট দোকান- প্রায় সব জায়গাতেই দেখা যায় সবুজ চায়ের আয়োজন। স্থানীয়ভাবে এই চা পানের রীতিকে বলা হয় ‘আতায়া’ বা ‘আত্তায়া’। আতায়া তৈরির নিয়মটাও বেশ আলাদা।একই চা-পাতা দিয়ে তিনবার চা তৈরি করে পরিবেশন করা হয়। চায়ের সঙ্গে থাকে প্রচুর চিনি, অনেক সময় পুদিনাও। ছোট পাত্রে চা ফুটিয়ে বারবার ওপর থেকে নিচে ঢালা হয়। এতে চায়ের ওপর তৈরি হয় ঘন ফেনা।

এক কাপ শেষ হলেই আয়োজন শেষ হয় না। আসে দ্বিতীয় কাপ, তারপর তৃতীয় কাপ। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। এই সময়টুকুই আসলে আড্ডার সময়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিচিতরা একসঙ্গে বসে গল্প করেন, নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন।

সাহেল অঞ্চলে তিন কাপ চায়ের আলাদা অর্থও রয়েছে। প্রথম কাপকে জীবনের মতো তেতো, দ্বিতীয় কাপকে বন্ধুত্বের মতো মিষ্টি আর তৃতীয় কাপকে ভালোবাসার মতো কোমল বলা হয়।

আতায়ার এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে চীনের চা ব্যবসারও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মৌরিতানিয়ায় এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায়। ২০২৪ সালে দেশটি মোট ৬ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলারের চা আমদানি করে। এর মধ্যে চীন থেকেই আসে ৬ কোটি ৫১ লাখ ডলারের চা।

অর্থাৎ দেশটির মোট চা আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল চীনা চা। গাম্বিয়াতেও চীনের অবস্থান শক্তিশালী। ২০২৪ সালে দেশটি ৩ কোটি ১৩ লাখ ডলারের চা আমদানি করে। এর মধ্যে ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের চা আসে চীন থেকে। মালি, সেনেগাল ও নাইজারেও চীনা সবুজ চায়ের ব্যবহার ব্যাপক। এসব দেশে আতায়া শুধু বাজারের পণ্য নয়, সামাজিক জীবনেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

আতায়া পানের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। সকালে, দুপুরে কিংবা সন্ধ্যায়- যেকোনো সময়ই এটি তৈরি হতে পারে। বাড়ি, দোকান, বাজার কিংবা অফিস- সব জায়গাতেই চলে এর আয়োজন। মৌরিতানিয়ায় সরকারি অফিসেও অতিথিদের চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। দেশটির দূতাবাসের একটি নির্দেশিকায় এই ঐতিহ্যকে ‘দেখা হওয়ার পর তিন কাপ চা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যামেরুনের সাংবাদিক কুয়াম জোয়েল অনোরে ২০২১ ও ২০২২ সালে মৌরিতানিয়া সফরের সময় এই অভিজ্ঞতা পান।

তাঁর চোখে, সরকারি দপ্তরে আতায়া পরিবেশন করাও সেখানে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কয়লার চুলায় চা তৈরি করেন। কর্মস্থলে বিরতির সময় সহকর্মীরা একসঙ্গে বসেন। এমনকি মরুভূমির দীর্ঘ পথে যাত্রা করা চালকদের সঙ্গেও থাকে ছোট চুলা ও চা তৈরির সরঞ্জাম।

সেনেগালের শিল্পী ও সামাজিক উদ্যোক্তা আলদি দিয়াসের কাছেও আতায়া মানে একসঙ্গে সময় কাটানো। তার মতে, খাবারের পর বা সন্ধ্যায় সবাই মিলে চা পান করতে বসলে কথাবার্তা জমে ওঠে। সমাজের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কও হয় এই সময়। এই অভ্যাস পরিবার থেকেই শেখা হয়। দিয়াসে জানান, তার বাবা-মা ও ভাইবোনদের কাছ থেকেই তিনি আতায়া তৈরির পদ্ধতি শিখেছেন।

সাহেলবিষয়ক গবেষক সেইদিক আব্বার মতে, তিন দফায় চা পরিবেশনের মধ্যে আসল বিষয়টি হলো সময় দেওয়া। তাঁর ভাষায়, এক কাপ চায়ের সময় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে কথা শেষ নাও হতে পারে। দুই কাপেও হয়তো আলোচনা শেষ হবে না। কিন্তু তিন কাপ চায়ের মধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলার, একসঙ্গে থাকার এবং সময় কাটানোর সুযোগ পায়।

এই চায়ের সঙ্গে তার নিজের শিকড়ের সম্পর্কও রয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর দূরে থাকার পরও তিনি আতায়াকে নিজের পরিচয়ের একটি অংশ মনে করেন। সাহেল অঞ্চলে চায়ের এই সংস্কৃতি কত পুরোনো, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মরুভূমির বাণিজ্যপথের গল্পও। উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সাহারা পেরিয়ে বহু বছর ধরে বাণিজ্য চলেছে। উটের কাফেলায় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীরা। পথে বিশ্রামের সময় চা পান ছিল তাদের সামাজিকতারও একটি অংশ। সময় গড়ানোর সঙ্গে চীনের সবুজ চা এই অঞ্চলে আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

স্থানীয়রা জানতে পারেন, চীনেও চা পানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সামাজিক সংস্কৃতি রয়েছে। এরপর চীন থেকে চা আমদানি বাড়তে থাকে।

ফলে চায়ের পাতা চীন থেকে এলেও আতায়ার পুরো আয়োজনটি হয়ে উঠেছে সাহেল অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি। সেইদিক আব্বার মতে, এটি এখন আর কেবল পুরোনো কোনো অভ্যাস নয়। চা পানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই দীর্ঘ আড্ডা সাহেল অঞ্চলের মানুষের পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্কেরই একটি অংশ।

অর্থাৎ, চীনের চা এখানে এসে শুধু পানীয় হয়ে থাকেনি। তিন কাপ চায়ের ফাঁকে এটি হয়ে উঠেছে গল্প, বন্ধুত্ব, পরিবার আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরির এক সহজ আয়োজন।